**"একাকীত্বের ভার: এক বৃদ্ধের না বলা কথা"**

এখন আমি অনেক বুড়ো হয়ে গেছি! আমি ভালো চলতে পারি না। ঠিকমতো চোখে দেখতে পাই না। শোনার ক্ষমতাও অনেক কমে গেছে। অনেকবার বলতে হয় একটা কথা! আমার অনেক কষ্টের ফসল এই ছেলে-মেয়েরা। এদেরকে অনেকবার বলেছি, আমাকে একটু সময় দিতে। জানো, আমার এখন খুব একা লাগে। আমি তো কাউকে খুব বেশি বিরক্ত করি না। আমি বারান্দার এক কোণায় পাহারাদারের মতো শুয়ে-বসে চব্বিশটা ঘণ্টা পার করে দেই। বারান্দার কোণায় থাকি, এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। হয়তো এটা একটা নিয়ম হয়ে গেছে। আমরাও তো সেটাই করেছিলাম আমাদের বাবা-মায়ের বেলায়। আমার বাবা-মাকেও দেখেছিলাম আমার দাদু আর ঠাম্মির বেলায়।

আমার এখন মনে হয়, তখনকার (শৈশব) এক ঘণ্টা সমান এখনকার এক দিন। খুব কষ্ট হয় এখনকার সময়টা পার করতে। জানি না আর কত দিন বাঁচব। যদি ঈশ্বর আমাকে নিয়ে যেত! জানো, আগে খুব বাঁচতে ইচ্ছে করত। বাঁচার ইচ্ছায় কোথায় না ছুটে বেড়িয়েছি। এখন বাঁচতে ঘৃণা হয়!

আমার স্ত্রী ২ বছর আগে মারা গেছে। ওর সাথে আমার খুব ঝগড়া হতো। ও অল্পতেই রেগে যেত, তাই মাঝে মাঝে আমার খুব বিরক্ত লাগত। ও আমাকে বলত, "তোমাকে ভালোবাসি বলেই তো তোমার ওপর রাগ করি।" তারপর কিছু বলতে পারতাম না আমি। বছর দশেক আগে থেকে ও আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল। আমরা আমাদের ভালো-মন্দ সব ভাগাভাগি করে নিতাম। তখন কেন জানি ওর ভালোতে আমি আনন্দ পেতাম আর খারাপটাতে কষ্ট পেতাম। আমার পাঞ্জাবি-ধুতি ময়লা হলে এখন কেউ বলে না, "এগুলো খুলে দাও, আমি ধুয়ে দেব।" কেউ বলে না, "তোমার দাড়ি মচ কাটার মতো হয়ে গেছে, কাটতে হবে।" মাঝে মাঝে ও কেটেও দিত।

আমার কিশোর-যৌবনের বন্ধুরাও অনেক বুড়ো হয়ে গেছে। কে জানে, তারা কেমন আছে! কারো কারো হয়তো আমার মতো অবস্থা বা আমার চেয়েও খারাপ।

এই সময়টায় না, সবাইকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে! সবাইকে! তবে আমার কী মনে হয় জানো? ঐ সময়ের চেয়ে ওকে (স্ত্রী) এখন খুব বেশি দরকার ছিল। কিছু না হোক, অন্তত গল্প করার একজন তো পেতাম! শুধু আমার কথা বলছি না, ওর মতো আমি মারা গেলে ওকেও হয়তো আমার খুব দরকার হতো। যখন রক্তের তেজ ছিল, ইচ্ছা করলে ওকে (স্ত্রী), ছেলে-মেয়েকে ছাড়া আরও অনেককেই পেতাম। ডাকলেই তারা কাছে আসত! অনেক বন্ধু-বান্ধব ছিল আমার! চায়ের দোকানে সারাদিনের সারা রাজ্যের সব খবর জমা থাকত। সন্ধ্যায় চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সেগুলো তথ্যের ঝুলিতে ভরা আর তা নিয়ে বাড়িতে ফেরা। তারপর বউয়ের মুখ কাল, পাওনাদারের তাগাদা, ছেলে-মেয়ের আবদার—আরো কত কী! সকাল হলেই কাজের চাপ। সব সামলে নিজের জন্য সময় বের করাটা খুব কঠিন হয়ে পড়ত!

সেদিন আশ্রুভরা দু’চোখ নিয়ে বৃদ্ধ লোকটি বলেছিলেন, "থাক সে সব কথা! এই কঠিন পরিস্থিতি যে যেভাবেই, যেখানেই থাকুক না কেন, সবার জন্য সমান। তবে সত্যি বলতে, ওরা আমার পাশে আসে না—এটা নিয়ে আমার খুব বেশি অভিযোগ নেই। কর্মব্যস্ততায় সবাই এখন খুব ব্যস্ত। ওদের পরে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য অনেক রোজগার করতে হয়, এটা আমি বুঝি! তবে ঈশ্বরের কাছে একটাই ক্ষোভ—কেন আমার বৃদ্ধ বয়সের সঙ্গীকে নিয়ে গেলেন! আমাকে একা রেখে! ওনাকে এটুকু বোঝা উচিত ছিল। উনি তো এখনো বৃদ্ধ হননি, তাই হয়তো বোঝেন না এই বয়সে একা থাকার কত কষ্ট। বৃদ্ধ হলে ঠিকই বুঝবে!"

Comments

Popular posts from this blog

Who is Failing—Government, Producers, or Consumers?

**"সমুদ্র সৈকতে হারানো স্বপ্ন: মিরাজের জীবনসংগ্রাম"**

My First Flight Experience: A Journey from Dhaka to Jashore"