**"সমুদ্র সৈকতে হারানো স্বপ্ন: মিরাজের জীবনসংগ্রাম"**

আমার প্রকৃত নাম মেহেদি হাসান মিরাজ। কিন্তু আমাকে সবাই মিরাজ বলে ডাকে। আমি এখানে মিরাজ নামে পরিচিত হলেও আমার অনেক বন্ধু আমাকে মিরা বলেও ডাকে। হাসি পায়। বলি, এটা তো মেয়েদের নাম। যাইহোক, আমি তাদের সাথে ঝগড়া করতে যাই না। আমি এই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে মানুষের বসার ব্যবস্থা করি। এটা আমার চাকরি, বিনিময়ে আমি দিনে ১৫০ টাকা পাই। এতে করে আমার মাসে আয় হয় ৪৫০০ টাকা। আমার কোনো দিন ছুটি নেই। ছুটি হলে বা নিলে আমার আয়টা কমে যায়। এই টাকা দিয়েই আমি আমার সংসার চালাই। দুই ভাই-বোনের স্কুলের খরচও চালাতে হয় এই টাকার মধ্যে।

জানতে চাইলাম, "তুই এখানে কেন টাউট-বাটপারি করিস? পড়াশোনা করতে পারিস না?" কথাটা আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমাদের সিট কনফার্ম হয়ে যাওয়ার পর। তারপর সে উপরের কথা বলেছিল। কথায় কথায় আবার প্রশ্ন করলাম, "তোর বাবা কি তোর মাকে ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও?" প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছিল, "হ্যাঁ। সে আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গেছে, না ফেরার দেশে।" থমকে গেলাম! মনে মনে চিন্তা করলাম, অন্যায় করে ফেলেছি। কেন যে এসব কথা বলতে গেলাম! আবার নির্লজ্জের মতো জিজ্ঞাসা করলাম, "কি হয়েছিল তোর বাবার?"

মিরাজ নামের এই ছেলেটি বলতে শুরু করল – "আমাদের গ্রামে তেমন কোনো শিক্ষিত মানুষ নেই। আমার বাবার অনেক ইচ্ছে ছিল আমাকে অনেক লেখাপড়া করাবে। তার ইচ্ছে অনুযায়ী সে আমাকে সে ভাবে গড়ে তুলতে শুরু করল। ভাই-বোন বড় হতে শুরু করল। সংসারের খরচ বেড়ে গেল। বাবার ওপর অনেক ধকল যাচ্ছিল। তারপর একদিন আমার মাকে বলল, 'আমি ওদের সাথে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাব। তা না হলে ওদের ঠিকঠাক স্কুলে পড়াতে পারব না।' মা বাধা দিল না। বাবা চলে গেলেন, আর ফিরে এলেন না। জানা যায়, ঝড়ের কবলে পড়ে মারা গেছেন, বিলীন হয়ে গেছেন সমুদ্রে।"

ছেলেটি কথার মোড় ফিরিয়ে বলেছিল, "জানেন! আমি প্রতিদিন এখানে আসতাম। যত দূর চোখ যায় তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, আমার বাবা ফিরে আসবে। সন্ধ্যা হলে আমি বাড়ি ফিরতাম, মা অনেক বকাবকি করত। আমি আল্লাহর কাছে বলতাম, 'আমি আর কিছু চাই না, শুধু আমার বাবাকে ফিরিয়ে দাও।' আর অনেক কান্নাকাটি করতাম। আমার সব স্বপ্ন ভেঙে গেল।"

নিঃশ্বাস নিয়ে ছেলেটি বলেছিল, "অবশেষে এই সমুদ্র সৈকতে কুড়িয়ে পেলাম আমার কর্মজীবনের কাজ—মানুষের শরীর, মাথা ম্যাসাজ করা। যখন ভালো মানুষদের দেখি, তখন আমারও ভালো মানুষের মতো বেঁচে থাকতে ইচ্ছে হয়। আমি আমার বন্ধুদের বলি, 'দেখবি, আমিও এই রকম হব।' ওরা আমাকে বলে, 'তুই তো লেখাপড়া করিস না, তাহলে কিভাবে হবি?' থমকে গিয়ে বলি, 'আমার ভাই-বোন তো হবে!' তারপর এখানের কিছু লোক মিলে আমাকে এই চাকরিটা দিল।"

আবারও দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ছেলেটি বলেছিল, "জানেন! আমি এখন আর নামাজ-কালাম কিছুই করি না। শুনেছি, সব পাপের বিচার-আচার মৃত্যুর পরে হয়। কিন্তু আল্লাহ কি আমার বিচার আগেই নিয়েছেন! আমাকে কেন এই বয়সে এত বড় বোঝা বইতে হবে? কী অন্যায় আমি করেছিলাম? কী দোষ আমার ছিল? বাবার ইচ্ছে পূরণ করার জন্য আমি আমার দুই ভাই-বোনকে পড়াশোনা করাচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করবেন।"

কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটির চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল সমুদ্র সৈকতের বালির উপর পড়ল। এরকম অনেক কান্নার জল হয়তো সমুদ্র সৈকতের মতো অনেক জায়গায় পড়ে। তারপর তা বিলীন হয়ে যায়। কোথাও কেউ কখনও মনে রাখে না। বাসায় ফেরার পথে ভাবছিলাম, হয়তো এরকম সব টাউট-বাটপারদের জীবনে একটা গল্প আছে, যার সব কিছু কখনও লেখা সম্ভব না।

Comments